ক্যাপিটাল মেশিনারিজ বা মূলধনি যন্ত্রপাতি হিসেবে নামমাত্র শুল্কে দেশে আমদানি হচ্ছে ভ্যারিয়েবল রেফ্রিজারেন্ট ফ্লো (ভিআরএফ) বা চিলারের মতো কমার্শিয়াল এসি। এসব এসি বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি ও স্থাপন হচ্ছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। ফলে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। মূলধনি যন্ত্র হিসেবে মাত্র ১ শতাংশ শুল্কে ও বিনা ভ্যাটে আমদানি হচ্ছে ভিআরএফ ও চিলারের মতো এইচভ্যাক সিস্টেম। বিপরীতে দেশে উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোকে এসির কাঁচামাল আমদানিতে গুনতে হচ্ছে গড়ে ১৫ শতাংশের বেশি শুল্ক ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট। এতে স্থানীয় উৎপাদক ও আমদানিকারকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অসম শুল্ক ও ভ্যাট পার্থক্য। ফলে সম্ভাবনাময় এ খাতে স্থানীয় বিনিয়োগ বাড়ছে না। এ অবস্থায় স্থানীয় উৎপাদকরা অসম শুল্ক বাধা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসি একসময় বিলাসপণ্য হলেও বর্তমানে প্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গরমের তীব্রতা বাড়ছে। ফলে অফিস থেকে শুরু করে বাড়ির প্রয়োজনীয় অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে এসি। তারা বলছেন, আমদানিকারক ও উৎপাদকদের মধ্যকার অসম শুল্ক সমস্যা সমাধান করতে হবে। দেশীয় উৎপাদকদের জন্য সুরক্ষানীতি প্রণয়ন করতে হবে। এতে বিনিয়োগ বাড়বে, সৃষ্টি হবে কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা বাঁচবে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, গত বছরের ২৯ মে জারি করা সংবিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রণ আদেশে মূলধনি যন্ত্রপাতির ওপর সব ধরনের মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক অব্যাহতি দিয়ে ১ শতাংশ কাস্টমস শুল্ক নির্ধারণ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই আদেশের এইচএস কোড ব্যবহার করে মূলধনি যন্ত্র হিসেবে মাত্র ১ শতাংশ শুল্কে ভিআরএফ বা চিলারের মতো কমার্শিয়াল এসি আমদানি হচ্ছে এবং সেগুলো বাজারে বিক্রিও করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ভিআরএফ ও চিলার মূলত কমার্শিয়াল এসি। এগুলো মূলধনি যন্ত্রপাতির আওতায় পড়ে না। কিন্তু কিছু আমদানিকারক এসআরও ১৯১-এর সংশ্লিষ্ট এইচএস কোডের অপব্যবহার করে ভিআরএফ বা চিলারের মতো এসিকে মূলধনি যন্ত্রপাতি দেখিয়ে মাত্র ১ শতাংশ শুল্কে আমদানি করছেন। এরপর সেগুলো উচ্চবিত্তের ডুপ্লেক্স বাড়ি, রেস্টুরেন্ট, আবাসিক হোটেল, হাসপাতালসহ বিভিন্ন মাঝারি ও বৃহৎ বাণিজ্যিক স্থাপনায় বিক্রি ও ব্যবহার হচ্ছে।
অপরদিকে স্থানীয় পর্যায়ে ভিআরএফ ও চিলারের মতো এসি উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল আমদানিতে গুনতে হচ্ছে ১৫ শতাংশ কাস্টমস শুল্ক এবং আরো ১৫ শতাংশ ভ্যাট। ফলে সম্ভাবনাময় এ খাতে নতুন বিনিয়োগ আসছে না। যেসব প্রতিষ্ঠান দেশে কারখানা স্থাপন করছেন তারাও এ খাত নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশে ওয়ালটন, আর্নেস্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস (প্রা.) লিমিটেড এবং এমএইচএম মেশিনারিজ বিডি ভিআরএফ ও চিলার উৎপাদন করে থাকে। তাদের পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি হয়। তবে ওয়ালটন তাদের উৎপাদিত ভিআরএফ ও চিলার এসি সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে রফতানিও করেছে। এছাড়া এ খাতে দেশী-বিদেশী আরো বিনিয়োগ পাইপলাইনে রয়েছে। কিন্তু অসম শুল্ক কাঠামোয় এ খাতে বিনিয়োগ নিয়ে দ্বিধায় আছেন উদ্যোক্তারা।
ওয়ালটন গ্রুপের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী পরিচালক ও চিফ বিজনেস অফিসার (এসি) মো. তানভীর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ক্যাপিটাল মেশিনারিজ হচ্ছে মূলধনি যন্ত্র। যেটিতে ইন্ডাস্ট্রির ভ্যালু এডিশন হবে। দেশের উৎপাদন খাতে অবদান রাখবে। কিন্তু ক্যাপিটাল মেশিনারিজের নামে আমদানীকৃত পণ্য যদি বাসাবাড়িতে ব্যবহার হয়, তখন তা কীভাবে মূলধনি যন্ত্র হয়? কিংবা এগুলো যদি লাক্সারি রেস্টুরেন্ট, পর্যটন এলাকার বিভিন্ন স্থাপনা, বিলাসবহুল রিসোর্ট কিংবা কনভেনশন হলের মতো জায়গায় ব্যবহৃত হয়, তখন মূলধনি যন্ত্রপাতির যে সংজ্ঞা সেটির পুরো অপব্যবহার হয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট কোনো ইন্ডাস্ট্রির প্রয়োজনে এইচভ্যাক আমদানিকে আলাদা করে সুনির্দিষ্ট করা যেতে পারে। তাহলে মূলধনি যন্ত্রপাতি হিসেবে প্রদত্ত সুবিধার অপব্যবহার হবে না এবং সরকারও কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হবে না।’
ওয়ালটন গ্রুপের এ কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘বর্তমানে দেশীয় কোম্পানিগুলো এইচভ্যাক বা কমার্শিয়াল এসি উৎপাদন করছে। স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রফতানিও করছে। এ শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকারের নীতিসহায়তায় আনতে হবে। এটির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ব্যাপক। সরকার মূলধনি যন্ত্র আমদানির ওপর সুবিধা দিয়েছে, যাতে দেশে বিনিয়োগ হয়। বিনিয়োগকারীরা আকৃষ্ট হয়ে এখানে কারখানা স্থাপন করে। মূলধনি যন্ত্রও এখানে তৈরি সম্ভব। সেসব কারখানায় ফোকাস করা দরকার। সব মিলিয়ে এ খাত সম্পর্কে সরকারের পরিকল্পনা থাকতে হবে।’
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে বর্তমানে ভিআরএফ ও চিলারের চাহিদা প্রায় দেড় লাখ টন। স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদনের মাধ্যমে এ চাহিদা পূরণের সুযোগ তৈরি করতে পারলে এ খাতে ১৫ হাজারের মতো নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
দেশে এখন রেসিডেন্সিয়াল ও কমার্শিয়াল মিলিয়ে বছরে ছয়-সাত লাখ ইউনিট এসির চাহিদা রয়েছে। এ খাতে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। বাংলাদেশে ব্যবহৃত রেসিডেন্সিয়াল এসির ৯০ শতাংশ চাহিদা পূরণ করছে দেশীয় উৎপাদকরা। তবে ভিআরএফ ও চিলারের ক্ষেত্রে সেটি উল্টো। এ খাতে দেশীয় কোম্পানির অবদান মাত্র ১০ শতাংশের মতো। সরকারের নীতিসহায়তা পেলে ও অসামঞ্জস্যতা দূর করা গেলে এ খাতে আরো বেশি বিনিয়োগ হবে এবং শিল্প গড়ে উঠবে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। আমদানির প্রয়োজন না হলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। সরকার আরো বেশি রাজস্ব পাবে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে আরো বেশি রফতানি হবে।
আর্নেস্ট ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস (প্রা.) লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মামুনুর রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ খাতে শুল্ক একটা বড় সমস্যা। আরো বড় সমস্যা পণ্যের ব্যাখ্যায়। এ কারণে কাঁচামাল আমদানিতে কখনো কখনো শুল্ক ৬১-১০৮ শতাংশ পর্যন্ত চলে যাচ্ছে। আমাদের এসব পণ্যের নির্দিষ্ট এসএস কোড নেই। ফলে কাস্টমস এটাকে সবসময় অন্য এসএস কোডে নেয়ার জন্য চেষ্টা করে। অর্থাৎ এখানে ভিন্ন এসএস কোড ব্যবহার করা হয়। এসব টেকনিক্যাল সমস্যাগুলোরও সমাধান করা জরুরি। কারণ ১৩ বা ১৫ শতাংশ শুল্ক স্থানীয় পর্যায়ে হয়তো সরকারের সমন্বয়ের সুযোগ আছে। কিন্তু পণ্যের ব্যাখ্যা না থাকায় শুল্ক ১০৮ শতাংশ পর্যন্ত চলে যাচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমদানিকারক এবং দেশীয় উৎপাদকদের মধ্যে শুল্ক ও ভ্যাটের অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। এজন্য দেশীয় কারখানাগুলো তাদের সঙ্গে খরচ ও দামে পেরে উঠতে পারছে না। এখানে সরকারি নীতিসহায়তা প্রয়োজন।’
সার্বিক বিষয়ে জানতে গতকাল রাতে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করলেও তিনি ধরেননি।